মো: রমিজ আলী,
সীতাকুণ্ড (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি:
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার বুকে দাঁড়িয়ে থাকা ঐতিহাসিক হাম্মাদিয়া জামে মসজিদ প্রায় ৪৯৩ বছর ধরে বহন করে চলেছে ধর্মীয় ঐতিহ্য, আধ্যাত্মিকতা ও প্রাচীন স্থাপত্যশৈলীর অনন্য ইতিহাস। স্থানীয়দের কাছে এটি শুধু একটি মসজিদ নয়—বরং শতাব্দীজুড়ে গড়ে ওঠা বিশ্বাস, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের জীবন্ত প্রতীক।
ঐতিহাসিক সূত্র ও জনশ্রুতি থেকে জানা যায়, ১৬শ শতাব্দীর দিকে মুসলিম শাসনামলে এই মসজিদটির প্রতিষ্ঠা। সে সময় সীতাকুণ্ড ছিল ধর্মীয় ও বাণিজ্যিক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ এলাকা। সুফি সাধক ও ধর্মপ্রাণ ব্যক্তিদের হাত ধরে গড়ে ওঠা এই মসজিদ ধীরে ধীরে পরিণত হয় এলাকার ধর্মীয় কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দুতে। যুগে যুগে অসংখ্য আলেম-ওলামা এখানে ধর্মীয় শিক্ষা দিয়েছেন, কোরআন-হাদিসের পাঠদান করেছেন এবং ইসলামী মূল্যবোধ প্রচারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।
স্থাপত্যগত দিক থেকে হাম্মাদিয়া জামে মসজিদ বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। প্রাচীন চুন-সুরকি ও পোড়ামাটির ইটের গাঁথুনিতে নির্মিত মসজিদটির পুরু দেয়াল, খিলানযুক্ত দরজা-জানালা এবং সরল কিন্তু নান্দনিক নকশা অতীতের স্থাপত্য ঐতিহ্যের সাক্ষ্য দেয়। আধুনিকতার ছোঁয়া লাগলেও মূল কাঠামো এখনো পুরনো দিনের সৌন্দর্য ধারণ করে আছে। অনেকেই মনে করেন, এই মসজিদের গঠনশৈলীতে মধ্যযুগীয় বাংলার ইসলামী স্থাপত্যের প্রভাব স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।
শুধু স্থাপত্য নয়, ধর্মীয় গুরুত্বের দিক থেকেও মসজিদটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় ছাড়াও জুমার নামাজে দূর-দূরান্ত থেকে মুসল্লিরা এখানে সমবেত হন। পবিত্র রমজান মাসে তারাবির নামাজ, ইফতার মাহফিল এবং কোরআন তিলাওয়াতের মাধ্যমে মসজিদটি হয়ে ওঠে এক আধ্যাত্মিক মিলনমেলা। ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার সময় হাজারো মানুষের উপস্থিতিতে পুরো এলাকা উৎসবমুখর হয়ে ওঠে, যা কয়েকশ বছরের ধারাবাহিক ধর্মীয় সংস্কৃতিরই বহিঃপ্রকাশ।
স্থানীয় প্রবীণদের মতে, এই মসজিদকে ঘিরে গড়ে উঠেছে বহু স্মৃতি ও ঐতিহ্য। একসময় এখানে গ্রাম্য সালিশ, ধর্মীয় আলোচনা এবং সামাজিক বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হতো। ফলে এটি কেবল ইবাদতের স্থান নয়, বরং সামাজিক সংহতি ও ঐক্যেরও কেন্দ্র ছিল।
তবে সময়ের পরিক্রমায় প্রাচীন এই স্থাপনাটি সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা আরও বেশি অনুভূত হচ্ছে। স্থানীয়দের দাবি, যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ ও সরকারি উদ্যোগের মাধ্যমে এই ঐতিহাসিক মসজিদকে সংরক্ষণ করা হলে এটি দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহ্যবাহী নিদর্শন হিসেবে স্বীকৃতি পেতে পারে।
এলাকাবাসীর ভাষায়, “হাম্মাদিয়া জামে মসজিদ আমাদের গর্ব, আমাদের ইতিহাস। এটি শুধু একটি ধর্মীয় স্থান নয়, বরং আমাদের পূর্বপুরুষদের রেখে যাওয়া অমূল্য সম্পদ।”
শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে টিকে থাকা এই মসজিদ আজও নীরবে বলে যায় অতীতের গল্প—যেখানে মিশে আছে ধর্মীয় অনুশাসন, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এবং মানুষের অবিচল বিশ্বাসের ইতিহাস।
সম্পাদক: মোছাঃ নার্গিস সুলতানা। নির্বাহী সম্পাদক, আনোয়ার হোসেন রকি। প্রকাশক: মোঃ হাবিবুল্লাহ daily10starbd24.live
Copyright © 2026 daily10starbd24.live. All rights reserved.