আনোয়ার হোসেন রকি, নির্বাহী সম্পাদক।

​বাঙালি জাতির প্রাণের উৎসব পহেলা বৈশাখ। কালচক্রের আবর্তনে আবারও আমাদের দুয়ারে উপস্থিত হয়েছে ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ। জীর্ণ পুরাতনকে বিদায় জানিয়ে নতুনের আবাহন করার এই লগ্ন শুধু ক্যালেন্ডারের পাতা পরিবর্তনের কোনো আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং এটি বাঙালির আত্মপরিচয়, অসাম্প্রদায়িক চেতনা এবং হাজার বছরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের এক মহা-মিলনমেলা।

 

ঐতিহ্যের শেকড়ে ফেরার দিন:

​মুঘল সম্রাট আকবরের সময়কালে কর আদায়ের সুবিধার্থে যে ফসলি সনের প্রবর্তন হয়েছিল, তা আজ আমাদের জাতীয় জীবনে এক অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে। গ্রামবাংলার মেলা, হালখাতা, আর লাঠিখেলা থেকে শুরু করে আজকের শহুরে জীবনের মঙ্গল শোভাযাত্রা—সবই আমাদের জাতিগত ঐক্যের প্রতীক। ২০১৬ সালে ইউনেস্কো কর্তৃক মঙ্গল শোভাযাত্রাকে ‘বিশ্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য’ হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান আমাদের এই উৎসবকে নিয়ে গেছে এক বৈশ্বিক উচ্চতায়।

 

সংকীর্ণতা ও অপশক্তির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ:

​আজকের দিনে পহেলা বৈশাখের গুরুত্ব কেবল আনন্দ-উৎসবে সীমাবদ্ধ নেই। বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে এই উৎসবটি হয়ে উঠেছে যেকোনো ধরণের মৌলবাদ, অসহিষ্ণুতা ও সংকীর্ণ মানসিকতার বিরুদ্ধে এক বলিষ্ঠ সাংস্কৃতিক প্রতিবাদ। পহেলা বৈশাখ আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে—ধর্ম যার যার, কিন্তু উৎসব আর সংস্কৃতি সবার। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে এক কাতারে দাঁড়িয়ে ‘এসো হে বৈশাখ’ গাওয়ার মধ্যেই লুকিয়ে আছে প্রকৃত বাংলাদেশের ছবি।

 

আগামীর প্রত্যাশা:

​তবে কেবল একদিনের উদযাপনে এই চেতনাকে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। আমাদের প্রত্যাশা:

 

সাংস্কৃতিক চর্চা: প্রান্তিক পর্যায় থেকে শুরু করে নগরজীবন পর্যন্ত শুদ্ধ বাংলা সংস্কৃতির চর্চা ছড়িয়ে দিতে হবে।

 

অর্থনৈতিক গতিশীলতা: ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের প্রসারে বৈশাখী মেলার গুরুত্ব অপরিসীম। দেশীয় পণ্য ব্যবহারের মাধ্যমে গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে হবে।

 

অসাম্প্রদায়িকতা: বৈশাখের এই মিলনমেলার চেতনাকে সারা বছর আমাদের হৃদয়ে লালন করতে হবে, যাতে কোনো বিভেদ আমাদের ঐক্য বিনষ্ট করতে না পারে।

 

​”মুছে যাক গ্লানি, ঘুচে যাক জরা, অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা।”

​রবীন্দ্রনাথের এই অমীয় বাণীর মতোই নতুনের কেতন উড়িয়ে আসুক বৈশাখ। ফেলে আসা বছরের ব্যর্থতা ও জরাজীর্ণতাকে পেছনে ফেলে আমরা যেন এক উন্নত, সমৃদ্ধ এবং মানবিক বাংলাদেশ গড়ার শপথ নিতে পারি।

শুভ নববর্ষ!